ঝিনাইদহে দাম্পত্য ভাঙনের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা: সামাজিক উদ্বেগ বাড়ছে
মো:মিল্টন হোসেন জেলা প্রতিনিধি ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ – দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঝিনাইদহ জেলায় তালাক এবং বিবাহ বিচ্ছেদের হার উদ্বেগজনক মাত্রা স্পর্শ করেছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সহনশীলতার অভাব, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব মিলিয়ে ভাঙনের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।জেলা রেজিস্টার অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জেলায় মোট ৩ হাজার ১৭৭টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে—প্রায় প্রতিদিন ৮টি। একই সময়ে ৭ হাজার ৩২৭টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ নতুন সম্পর্ক তৈরির পাশাপাশি ভাঙনের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।তালাকের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্ত্রী কর্তৃক তালাকের সংখ্যা ১ হাজার ১৬৬টি, স্বামীর পক্ষ থেকে ২৫৯টি এবং উভয়ের সম্মতিতে ১ হাজার ৭৫২টি। সরাসরি স্বামী বা স্ত্রীর উদ্যোগে হওয়া তালাকের ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় সাড়ে চার গুণ বেশি, যা পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তিত বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।গত বছরের পরিসংখ্যানও একই প্রবণতার কথা বলে। ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৪৬টি বিয়ের বিপরীতে ৩ হাজার ৯৮৪টি তালাকের ঘটনা ঘটেছিল। ওই বছর স্ত্রী কর্তৃক তালাকের আবেদন ছিল ১ হাজার ৭৪৬টি এবং পুরুষের পক্ষ থেকে ৩৮৪টি। ২০১৯ থেকে ২০২৪—এই ছয় বছরে জেলায় প্রায় ১৮ হাজার তালাকের ঘটনা ঘটেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাকে প্রমাণ করছে।স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ঝিনাইদহ পৌর কাজী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান জানান, পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে ২০২৪ সালে ৮১০টি বিয়ের বিপরীতে তালাক হয়েছে ৩৩৪টি—প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৮টি। একই বছরে পৌরসভায় ৫৫০টি তালাকের নোটিশ জমা পড়ে। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসেই জমা পড়েছে ৪৪টি নোটিশ, যা আগের প্রবণতাকে অক্ষুণ্ণ রাখছে।জেলার ছয়টি পৌরসভা, মানবাধিকার সংগঠন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, বিভিন্ন নারী সংস্থা এবং জেলা জজ আদালতের লিগ্যাল এইড অফিসেও প্রতিদিন অসংখ্য তালাক আবেদন জমা পড়ছে। নোটিশ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষদের অভিযোগে পরকীয়া, দাম্পত্য কলহ ও আচরণগত দ্বন্দ্ব প্রধান। নারীদের আবেদনে উঠে এসেছে শ্বাশুড়ি-ননদের সঙ্গে বিরোধ, স্বামীর সন্দেহপ্রবণতা, মাদকাসক্তি, যৌতুক দাবি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত।সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের কাজী সোহরাব হোসেন বলেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্রুত তালাক নোটিশ পাঠানোর প্রবণতা বাড়ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, বিদেশে অবস্থানরত স্বামীদের পরিবারেও বিচ্ছেদের ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন আলাদা থাকা, পারিবারিক অশান্তি এবং আত্মীয়স্বজনের দ্বন্দ্ব অনেক ক্ষেত্রে সংসার ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।ধর্মীয় ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া আলীয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মুফতি মো. রুহুল কুদ্দুস জানান, নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে ক্ষমতা প্রদান করা হলে তবেই স্ত্রী তালাকের উদ্যোগ নিতে পারেন; অন্যথায় তা সরাসরি কার্যকর হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই আইনি শর্ত পূরণ না করেই বিচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা পরবর্তীতে জটিলতা তৈরি করছে।আইনজীবীদের মতে, পারিবারিক বন্ধন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। জেলা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট এস এম মশিউর রহমান বলেন, সন্তানদের ওপর অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন দাম্পত্য সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষিত সমাজেও তালাকের প্রবণতা বাড়ছে, যা সমস্যার গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করছে।সচেতন মহল মনে করছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারস্পরিক সহনশীলতার অভাব এবং যোগাযোগের ঘাটতি ভাঙনের অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে ছোট ভুল বোঝাবুঝি দ্রুত বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে, যেখানে আলোচনার বদলে বিচ্ছেদকে সহজ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, ঝিনাইদহে তালাকের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা শুধু পারিবারিক নয়, সামাজিক ও প্রজন্মগত সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। পরিবারভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা, পারিবারিক কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত ও গভীর হতে পারে।
প্রযুক্তি সহায়তায়: softhost
Leave a Reply